SHARE

আমি ইসরাত জাহান। আমার নিজ জেলা বরিশাল, বর্তমানে ঢাকায় পরিবারের সাথে অবস্থান করছি। পড়াশোনা পোস্ট গ্রাজুয়েট ইন কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, সিলেট।

ফ্লিল্যান্সিং এ আসার গল্পটা?

দেশে বিদেশে হাজারো ফ্রিল্যান্সারের মধ্যেও আজ আমি একজন ক্ষুদ্র ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। কিভাবে আমি আজকের এই ক্ষুদ্র ফ্রিল্যান্সার, চলুন শোনা যাক সেই ঘটনা। আশেপাশে শুনতাম অনলাইন কাজ করে টাকা আয় করা যায়। ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না। আগে এখনকার মতো ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে এত বেশি ধারনা ছিলনা বা শেখার মতো প্রতিষ্ঠানও ছিলনা, তখন সিলেটের একটা আইটি প্রতিষ্টান “সিলেট আইটি একাডেমি” থেকে ফ্রিল্যান্সিং-এর ধারনা নেই, এবং আপওয়ার্কে একটা একাউন্ট খুলি।

ফ্রিল্যান্সার হিসাবে যাত্রা হয় যেভাবে।

ইন্টারনেট থেকেই সারারাত বিভিন্ন ওয়েব সাইট এর আর্টিকেল গুলো পড়তে থাকলাম এবং YouTube থেকে অনেক ভিডিও টিওটোরিয়াল ডাউনলোড করে কাজ শিখতে থাকলাম। তারপর 2013 March থেকে একের পর এক কাজ পেতে থাকলাম Odesk, elance, Guru সাইট থেকে। ওয়েব-ডেভেলপার দিয়ে শুরু, তারপর আরটিকেল রাইটার, আস্তে আস্তে মার্কেটিং এভাবেই আমার ফ্রিল্যান্সিং এর যাত্রা শুরু। 10000+ hours worked+ 101 জব শেষ করছি। UPWORK : 129 jobs, Fiverr : 540 project completed,এছাড়াও 2013 থেকে কাজ করছি মার্কেটপ্লেস এর বাহিরে সরাসরি ১টা Canada এর ক্লায়েন্টের সাথে।পাশাপাশি নিজের কাজ অন্যদের দিয়ে করিয়ে নিচ্ছি Belancer থেকে যার বেশিরভাগই বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার এবং নতুনদের কাজ শিখিয়ে সাহায্য করতেছি ।

ফ্লিল্যান্সিং-এর প্রথম কাজ আর আপনার অনুভূতি যদি বলতেন ।

জীবনের প্রথম কাজ ছিল ওয়েবসাইট ডিজাইন ,জীবনের প্রথম কাজ করে টাকা পাইনি কারন কাজ টা জমা দিতে দেরী হওয়ার বাইয়ার টাকাটা দেয়নি ।জবটাও ছিল Fixed price ।সেদিন থেকে নাকে হ্মত দিলাম আর Fixed price job করবোনা। তাই Hourly job করার জন্য যা যা করতে হয় করব। তাই web developer হওয়ার ইচ্ছে ছেড়ে মাকেটিং সেক্টরে কাজ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলাম। আমার ভালো বন্ধু Google এর সাহায্য জন্য হাত বারালাম।
জীবনের প্রথম কাজ করে টাকা পাইনি। যখন অন্য ক্লায়েন্টের কাজ করে টাকা পেলাম সেই টাকা তুলতে অনেক সমস্যাই পরি, ব্যাংকে SWIFT CODE আনতে যেয়ে SWIFT CODE কি তাই অনেক ব্যাংকার জানেন না। Payoneer মাষ্টারকার্ড পেয়েছিলাম অনেক কষ্টে আর মানিবুকার্স এর লেটারও পাইনি, পোস্ট অফিস এ অনেক ধর্না দিয়েও কোন লাভ হয়নি, যাইহোক সমস্যার কথা বলে শেষ করতে পারব না।ফ্রিল্যান্সিং পেশাটাকে আপনি কিভাবে দেখেন? আসলে ফ্রিল্যান্সিংটা কে পেশা নয় নেশা হিসাবে নিতে হবে। এখানে প্রতিনিয়ত আপনাকে নতুন কিছু জানার আর শিখার আগ্রহ থাকতে হবে। পেশাতে আপনার বিরক্তি থাকতে পারে, কিন্তু নেশা এমন একটা জিনিস যা প্রতিদিন আপনাকে নতুনের দিকে নিয়ে যাবে। এখানে কি করে টাকা আয় করা যায় তা ভাবলে হবে না, আপনাকে চিন্তা করতে হবে কি করে আপনি আরো ভাল কাজ শিখতে পারেন। এই ভাল কাজই আপনাকে আপনার লক্ষ্যে নিয়ে যাবে।

কাজ করতে করতে যদি বিরক্ত লাগে তখন আপনি কি করেন?

আসলে ফ্রিল্যান্সিং এমন একটা নেশা যেখানে বিরক্তি খুব কমই লাগে। তবে মাঝে মাঝে ক্লায়েন্ট সাপোর্ট দিতে দিতে বিরক্তি লাগে। তখন রিফ্রেশমেন্টের জন্য বই পড়ি, না হয় গান শুনি। মাঝে মাঝে প্রকৃতির মাঝেও নিজেকে হারিয়ে ফেলি।

ফ্রিল্যান্সিং-এ নতুনদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

আমাদের তরুণদের প্রবলেম হচ্ছে আমরা কোন কষ্ট ছাড়াই অনেক কিছু পেতে চাই। আর এখন আমি জানি যে ফ্রিল্যান্সিং জগতে কষ্ট ছাড়া কোন কিছুই অর্জন করা সম্ভব না। অর্থনৈতিক ও কর্মস্বাধীনতার জন্য ফ্রিল্যান্সিং খুবই কার্যকরী। বেকার থাকার দিন এখন শেষ। আপনি যদি একজন ভাল ফ্রিল্যান্সার হতে চান ইংরেজী তে ভালো দহ্মতা থাকতে হবে এবং কম্পিউটার সম্পর্কিত বিভিন্ন স্কিল অর্জন করুন। ফ্রিল্যান্সিং এমন একটি জায়গা যেখানে অল্প শিখে টিকে থাকা যায়না। আপনি প্রতিযোগিতা করবেন পৃথিবীর অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সাদের এর সাথে।আপনার প্রোফাইল টা সুন্দর করে সাজান। পোটপোলিও এড করুন, যে কাজটা আপনি সবচেয়ে ভাল পারেন সে কাজের জন্য বেশী করে বিড করুন।বিড করার সময় খেয়াল করুন ক্লায়েন্ট কি চেয়েছে। গদবাদা কভার লেটার কপি পেস্ট করবেন না। বিড করে কাজ না পেলেও হতাশ হবেন না। চেষ্টা করতে থাকুন। সাফল্য আপনি পাবেনই। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটাকে মনে হয়েছে তা হলো সততা ও সময়মত কাজ সম্পাদন করা। অধিকাংশ ক্লায়েন্টই প্রফেশনাল এবং ভালো লোক খোজে কাজ করানোর জন্য। যার সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে কাজ করানো যাবে, যদি আপনি খারাপ রেটিং পান, সেটা UPWORK হোক আর যেখানেই হোক, হয়তো ক্লায়েন্টের মেসেজের দ্রুত রিপ্লাই দেন নাই বা তার সাথে যোগাযোগ ঠিকমত রাখতে পারেন নাই, কিংবা তাকে ঠিকমতো ম্যানেজ করতে পারেন নাই, তাই খারাপ রেটিং পেয়েছেন। ভালো রেটিং পাওয়া খুবই সহজ, তার প্রধান কারন, সব ক্লায়েন্টের সাথেই সম্পর্ক ভালো রাখা আর খুব ভালো কমিউনিকেশন ।

ফ্রিল্যান্সিং করতে গিয়ে অনেকে নানান সমস্যায় পড়ে, এর থেকে সমাধান কি করে পেতে পারে? আপনার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলুন।

সব সময় ভাল রেটিং পেতে হলে যা করতে হবেঃ
* কাজ নেয়ার আগে চিন্তা করবেন কাজটা আপনি করতে পারবেন কিনা।
* ক্লায়েন্ট আপনাকে কোন মেসেজ পাঠালে সাথে সাথে মেসেজ এর রিপ্লাই দেয়ার চেষ্টা করবেন, এতে সে আপনার উপর ভরসা করবে।
* কাজ কোন সমস্যা হলে আগে ক্লায়েন্টকে জানাবেন, আগেই বন্ধু বান্ধব বা বড় ভাইদের জিজ্ঞেস করবেন না, ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলে সমাধান আনতে না পারলে প্রফেশনাল ফ্রীল্যান্সারদের সাহায্য নিন।
* ক্লায়েন্ট এর মেসেজের রিপ্লাই ফাস্ট দিতে হলে আপনাকে একটু পর পর মেইল চেক করতে হবে। আর সারাক্ষন তো ল্যাপটপ বা কম্পিউটার এর সামনে বসে থাকা সম্ভব না, তাই ভালো ভাবে মেইল চেক করা যায় এরকম একটি মোবাইল ফোন ব্যাবহার করতে পারেন, বর্তমানে খুব কম দামে ভালো ভালো এন্ড্রয়েড ফোন কিনতে পাওয়া যায়।
কখনোই টাইম ট্রেকার অন রেখে অযথা সময় নষ্ট করবেননা। ধরা পড়ে যাবেন এবং জবটা ও হারাবেন। নেগেটিভ ফিডব্যক ও পেতে পারেন এর ফলে। আর, ভালো ফিডব্যক এর জন্য ক্লাইয়েন্ট এর সাথে সুন্দর সম্পর্ক রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ন।

ফ্রিল্যান্সিং এর পাশাপাশি যা করছি।

আমি ২০১৭ সালের জানুয়ারী মাসে একটা ছোট পরিসরে কোম্পানি রান করি, যার টিম মেম্বার এখন ১৬ জন। যার বেশি ভাগ একদম নিম্ন পরিবার থেকে তুলে আনা, যাদের কারো বাবা ভ্যান চালায়, চা এর দোকান কিংবা মাছ বিক্রি করে কিন্তু ছেলে মেয়ে গুলো পড়াশুনা করে, নিজের চেষ্টাই আমরা এই ছেলেমেয়ে গুলোর পাশে দাঁড়িয়েছি। নিজেদের টাকায় ল্যাপটপ এর ব্যবস্তা করছি , কাজ শিখেয়ে স্যালারি বেসিস কাজ করাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য মেয়েদের নিয়ে কাজ করা , আমি আমার চিন্তা ধারা আর লক্ষ্যকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

আপনি তো একজন মেয়ে, সে ব্যাপারে বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য আপনি কিছু করছেন কি?

আমি সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের ও নতুনদের নিয়ে কাজ করতে চাই। আমি
স্বপ্ন দেখি একটা অজোপাড়া গাঁয়ের একটা মেয়ে কাজ করে UK/CANADA একটা কোম্পানির হয়ে। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।
সবার শেষ আপনাকে বলতে চাই , আপনার ব্যক্তিগত দিক থেকে ফ্রিল্যান্সিং ও আপনার কিছু কথা যদি শেয়ার করতেন। পরিশেষে, নিজের উপর আস্থা ও বিশ্বাস মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়। জীবনের সবচেয়ে বড় জয় হলো এমন কিছু করে দেখানো যা সবাই ভেবেছিল তুমি কখনোই করতে পারবেনা। আমি এটাই বলতে চাই যে ফ্রিল্যান্সিং আমার জীবনে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন, ব্যাক্তিগত ভাবে স্বাধীন, পরিবারকে সময় দিতে পারি শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং এর কল্যানে। আমি কৃতজ্ঞ আমার পরিবারের কাছে যারা আমায় সহ্য আর সাহায্য দুটোই করতেছে। আমার সমগ্র জীবন উৎসর্গ করলেও ঋণ শোধ হবে না!

প্রতিটা মানুষ তার কাজের স্বীকৃতি পেতে চায়, আমি ও তার ব্যতিক্রম নই, আমি হয়তো ৯-৫ টার চাকুরী করতেই পারতাম, তখন আমায় কিছু মানুষ চিনতো, তার সংখ্যা থাকতো নগন্য কিন্তু আমি যে পেশায় আছি , হয়তো আমায় ব্যক্তিগত ভাবে চেনেনা , কিন্তু নামে অনেকেই আমায় চেনে, এটা আমার কাছে এই জীবনে অনেকটা পাওয়া। সরকারি পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়া আমি অন্য কোনও জবে জীবনেও কোনোদিন পেতাম বলে মনে হয়না কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং-এর কল্যাণে অনেক অল্প সময় নিজের কাজের স্বীকৃতি,সম্মান দুটোই আমি পেয়েছি। বাংলাদেশ আইসিটি ডিভিশনের “বেস্ট ফ্রিল্যান্সার অ্যাওয়ার্ড ২০১৬ তে অ্যাওয়ার্ড” অর্জন করলাম, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ’। সরকারিভাবে কাজের সম্মাননা পাওয়া উৎসাহমূলক আমার জন্য এবং সেই সাথে সবার জন্য।সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন ,ভবিষতে দেশ ও জাতিকে যাতে আমার ভালো কাজের মাধ্যমে কিছু দিতে পারি। নতুন দের কাছে একটাই অনুরোধ কাজ শিখে মার্কেটপ্লেস আসুন। আপনি কাজ না, কাজই আপনাকে খুঁজবে, যদি আপনি ভালো কাজ পারেন। একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আমি নিজেও দেশে থেকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করি এবং এভাবেই দেশের অর্র্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়তা করি । আমি একজন গর্বিত বাংলাদেশী। আমি একজন গর্বিত ফ্রিল্যান্সার।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY